জীবনচক্র

- কাঞ্চন রায়

0
252

 

মা গত হয়েছেন আমার ছোট্টবেলায়। বাবা অসুস্থ সপ্তাহখানেক। ইদানীং শরীরটা ভালো কাটছে না উনার। ভয়ে ভয়ে দুরারোগ্য ব্যাধির কথা ভাবতে ভাবতেই আলমারির ভেতর হঠাৎ চোখ পড়লো বাবার পুরনো জরাজীর্ণ ডায়রীতে। হ্যাঁ, ডায়রী! যেখানে মানুষ তার জীবনের ঘটনাপ্রবাহ লিখে রাখেন।

ডায়রীর পৃষ্ঠা উল্টোতে উল্টোতে হঠাৎ “আফ্রোদিতি” নামটি দেখে চমকে উঠি! একরাশ বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করি- “বাবা! আফ্রোদিতি কার নাম?” উনি থমকে উঠলেন!

কিছুক্ষণ ভাববার পর থরথরে কণ্ঠে বললেন-
“রেখা, আমার প্রাক্তন প্রেমিকা! যাকে আমি আদর করে ‘আফ্রোদিতি’ বলে ডাকতাম।” বাবার এমন জবাবে অতল বোধে নেমে যাচ্ছিলাম। ভাবতে লাগলাম- “বাবা! তবে কোনো এক নারীর প্রেমিক ছিলেন! কাউকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন দিগন্ত থেকে দিগন্তহীন!”

ভদ্রমহিলার ঠিকানা টুকে দেখা করতে গেলাম আমি। কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন ভদ্রমহিলাটি।
– আমি কাঞ্চন, কাঞ্চন রায়! ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করছি।
– বলো! তোমার কাকে চাই?
– রেখা আন্টির সাথে দেখা করতে এসেছি!
উনি ব্যাপক বিস্মিত হয়ে উঠলেন!

ড্রয়িংরুমে মুখোমুখি বসলাম আমরা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সালোয়ারকামিজ পরে ছোফায় বসে আছেন উনি। ভদ্রমহিলা অবিবাহিত এবং নিঃসন্তান। জীবনের এতো বছরেও বিয়ে করেন’নি কেন জিজ্ঞেস করতেই টলমল করে উঠলো ভদ্রমহিলার চোখ!

– দেখুন! আমি আপনাকে চিনি! যৌবনে কেউ ভালবেসে আপনাকে “আফ্রোদিতি” বলে ডাকতেন! ভদ্রমহিলা আমার চেহারার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলেন। দীর্ঘক্ষণ বিষাদ ক্লান্ত চোখে তাকানোর পর জিজ্ঞেস করলেন- “কে, তুমি খোকা?”

বললাম- “বাবার মুখে আপনার কথা জেনেছি। উনি অসুস্থ অনেকদিন।” আমি শুধু আপনার পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি- যে একসময় আমার বাবার প্রেমিকা ছিলো, হৃৎপিণ্ডের রোমন্থনে প্রেমের ভাষায় কথা বলেছিলো, আঙ্গুল ছুঁয়ে নিভৃত চরনে হেঁটেছিলো মাইল মাইল পথ দ্বিধাহীন।

ভদ্রমহিলা স্মৃতির বিষাক্ত ছোঁয়ায় আমার হাত ধরে কেঁদে উঠেন সঙ্গীতমুখর। মনে হয় কোনো অমল বালিকা আমার হাত ধরে পরম করুণায় আশ্রয় খুঁজে চলেছেন। আসলে মেয়েরা কাঁদলে সেটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত হয়ে যায়, মেয়েদের কান্নার মতো শ্রেষ্ঠ সুর পৃথিবীর আর কোথাও নেই।

ভদ্রমহিলার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললাম- দেখুন! “প্রেম ক্ষণস্থায়ী! জোয়ার, ঝড়, ঘূর্নির মতো প্রেম জীবনে বারবার আসে এবং ওগুলোর মতোই ক্ষণস্থায়ী”- এমনটাই পড়েছি হুমায়ুন আজাদের “নারী” প্রবন্ধে। কিন্তু আপনি আয়রন অফ লেডি, বিরহতাপিত এক অনন্য নারীর আইডল। এতো বিরহতাপেও জীবনকে এগিয়ে নিয়েছেন বিনীত বেদনায়, নিঃসঙ্গ যাপন করেছেন অনেকবছর।

চোখের জল মোড়ানো কণ্ঠে বাবার অসুস্থতার কথা জানিয়ে ভদ্রমহিলাটিকে নিয়ে আসি বাড়ির পুরনো ঠিকানায়। বহুবছর পর প্রাক্তন প্রেমিকার বিরহপীড়িত মুখ দেখে থমকে উঠেন পরম নমস্য বাবা। স্মৃতিচারণে টলমল করে উঠে উভয়ের তৃষ্ণার্ত চোখ!

আর আমি বেলকনির গ্রিল ধরে ডায়রীর পৃষ্ঠা উল্টোতে উল্টোতে ভাবতে লাগলাম,
– “কতো দগদগে বিচিত্র বেদনার রঙ নিয়ে বাঁচে মানুষ!
– কতো বিচিত্র স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে মানুষ!”

জীবনচক্র || কাঞ্চন রায়

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here