লাবন্য

0
184

লাবন্য

-এন আই আলিফ

দুলাভাই আমাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দ্বায়িত্ব দিয়েছেন। তার মামাতো বোনকে তার বাসায় নিয়ে আসার দ্বায়িত্ব। এই দ্বায়িত্ব নেয়ার জন্য আমার বেশ কয়েকজন চাচাতো ফুপাতো ভাই রাজি ছিলো কিন্তু দুলাভাই আমাকে পাঠিয়েছেন। যখন ভাইকে জিজ্ঞাসা করলামঃ

-ভাই আমাকে দ্বায়িত্ব দেয়ার কারন?
ভাই বললেনঃ
–দুটো কারন আছে। প্রথমত তোর চরিত্র ভালো। দ্বিতীয়ত তুই আমার বোনকে পটানোর চেষ্টা করলেও সে তোর দ্বারা পটবেনা।
দুলাভাই একইসাথে আমার প্রশংসা এবং অপমান দুটোই করলেন।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুজন দোকানদারের ঝগড়া দেখছি। ঝগড়ার কারন আমি জানিনা তবে তারা অনেকক্ষন ধরে ঝগড়া করছেন। আমি খুব ভদ্রতার সাথে জিজ্ঞাসা করলামঃ
-ভাই আর কতোক্ষন ঝগড়া করবেন। এবার মারামারি শুরু করেন। অনেকক্ষন ধরে মারামারি দেখার অপেক্ষা করছি।
আশ্চর্যজনক ভাবে তাদের ঝগড়া থেমে গেলো। আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
–আপনি এসেছেন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য?
নারীকন্ঠ শুনে পেছন ফিরে তাঁকালাম। দুধে আলতা গায়ে হলুদ শাড়ি চাপিয়ে রূপের আগুন লাগিয়ে, খোঁপায় ফুল গুঁজে এক বঙ্গ ললনা দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি আবারো বললোঃ
–আপনি আলিফ ভাইয়া?
.
-জ্বি…
.
–আপনাকে শাহিন ভাইয়া পাঠিয়েছে?
.
-জ্বি… কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কিভাবে? আমাদের কখনো দেখা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ছেনা।
.
–আপনাকে আমি ভাইয়ার বিয়ের সময় দেখেছিলাম। বিয়ে বাড়িতে আপনি মোরগ ড্যান্স দিচ্ছিলেন। তাছাড়া বরের জুতো চুরি করতে এসে জুতো নিয়ে দৌঁড় দিলেন। তারপর…
.
-থাক আর বলতে হবেনা। আমার মনে আছে আমি উষ্টা খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। ওসব পুরোনো কথা। মনে রাখতে নেই।
.
–আচ্ছা ঠিক আছে। আমরা কি এখন বাসে করে যাবো?
.
-নাহ্ বাইকে।
.
–আপনি বাইক নিয়ে এসেছেন?
.
-জ্বি…
.
–বাইক কোথায়?
.
-ওই যে সামনের বাইকটা। আপনি বাইকে গিয়ে একটু বসুন আমি আসছি।
সুন্দরী গিয়ে বাইকে তার ব্যাগটা রাখলেন। তারপর বাইকে ঠেস দিয়ে বসলেন। যাকে ঠিক বসাও বলেনা আবার দাঁড়িয়ে থাকাও বলেনা। আমি তার থেকে একটু দূরে ভীড়ের মধ্যে এসে দাঁড়ালাম। এক লোক এসে সুন্দরীকে বললেনঃ
–আপু ব্যাগটা আপনার?
সুন্দরী বললোঃ
–জ্বি আমার।
লোকটা বললোঃ
–ব্যাগটা সরান। আপনি একটু সরে দাঁড়ান।
সুন্দরী একটু বিরক্তির সাথে বললোঃ
–সরে দাঁড়াবো মানে। আপনি অন্য কোথাও গিয়ে দাঁড়ান। আর বাইকে হাত দিচ্ছেন কেন। যান এখান থেকে।
লোকটা অবাক হয়ে বললোঃ
–আশ্চর্য আমার বাইক আমি নিবোনা।
সুন্দরী এবার লোকটার কথা শুনে বেশ অবাক হলো। কিছু একটা বুঝতে পেরে তার ব্যাগ হাতে নিয়ে বাইক থেকে সরে দাঁড়ালো। লোকটা তার বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো। আমি সুন্দরীর দিকে এগিয়ে গেলাম। তিনি বেশ রেগে বললেনঃ
–আপনি মিথ্যা বললেন কেন? ফাইজলামো করেন আমার সাথে। অন্যের বাইকে বসিয়ে চলে গেলেন।
আমি সুন্দরীর কথা শুনে একটু হাসার চেষ্টা করতেই সুন্দরী বললোঃ
–হাসবেন না। আপনার হাসি দেখতে বিরক্ত লাগছে। এমন ফাইজলামো করবেন না। আমি ফাইজলামো পছন্দ করিনা।
.
আমি নিজেও জানিনা আমি কেন ফাইজলামো করছি। সমস্যাটা হয়েছে গতকাল রাত থেকে। দুলাভাই আর কাজিনরা মিলে রাতে আমাকে ঘর থেকে বের করে দিচ্ছিলেন। তারা কিছু একটা খাবে কিন্তু আমাকে খাওয়াবেনা। দুলাভাই বলেছে আলিফকে খাওয়ালে সে নিতে পারবেনা। চিৎ হয়ে পড়ে থাকবে। আমি তাকে ভুল প্রমাণের জন্য দুলাভাইয়ের ঘর থেকে ব্যাগটা নিয়ে দৌঁড়ে অন্য ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে এক নিশ্বাসে পুরো বোতল শেষ করেছি। খুব তেতো কিছু একটা। তারপর কিছু মনে নেই। যখন চোখ খুলেছি তখন সকাল হয়ে গেছে। আর আমি চিৎ হয়ে চারদিকে হাত পা ছড়িয়ে ফ্লোরে পড়ে ছিলাম। ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই শুধু ফাইজলামো করতে ইচ্ছা করছে। এই হলো ঘটনা। গত রাতের ঘটনা ভাবতে ভাবতে ততোক্ষনে বাস চলে এসেছে। সুন্দরীকে সাথে নিয়ে বাসে উঠলাম। তাকে বারবার সুন্দরী বলছি সে দেখতে সুন্দরী সেজন্য নয়, কারন হলো তার নামটা ভুলে গেছি। দুলাভাই নামটা বলেছে কিন্তু নাম স্মরন করতে পারছিনা। একটাই নাম বারবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পল্টু। পল্টু আমাদের এলাকার পাগলের নাম। এই সুন্দরী তরুণীর নাম নিশ্চই পল্টু না। পল্টুর নাম মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার একটা কারন হলো এখানে আসার আগে পল্টু আমাকে লাঠি নিয়ে দৌঁড়ানি দিয়েছে। বেচারা পল্টু রাস্তার মাঝখানে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছিলো। আমি বললামঃ
-রাস্তা থেকে একটু সরে দাঁড়া। সে বললোঃ
–আমার উপর দিয়ে যা।
আমি বললামঃ
-তোকে সরে দাঁড়াতে বলছি তুই সরে দাঁড়াবি।
ব্যাস এভাবে ঝগড়ার সূত্রপাত। ঝগড়া থামলো যখন পল্টু রেগে লাঠি নিয়ে আমাকে দৌঁড়ানি দিলো। তবে আমি পালিয়ে আসার সময় বলে এসেছি “ব্যাটা পল্টু তোকে দেখে নিবো।”
আমি এসব কেন করছি সেটা আমি নিজেও জানিনা। মনে হচ্ছে এ সবই গতকাল রাতের বোতলটার তেলেসমাতি। বিকেল বেলাটা ফুরিয়ে সন্ধ্যা হতে চলেছে। গাড়ির জানালার কাঁচ ভেদ করে পাশে বসা সুন্দরীর গালে ঠোটে রোদ পড়েছে। মেয়েটা আসলেই অসম্ভব রকমের সুন্দর। বাঙালি নারীদের আসলে শাড়িতেই বেশি সুন্দর লাগে। বাঙালি মেয়েরা যখন শার্ট প্যান্ট পরে ঘুড়ে বেড়ায় তখন তাদের দেখলে ভাই ভাই ফিল আসে। মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছা করে ভাই আগুন হবে সিগারেট জ্বালাবো। আর পাশে বসা শাড়ি পড়া সুন্দরীদের দেখলে মনে উথাল-পাথাল প্রেমের জোয়ার আসে। মেয়েটা কানে হেডফোন গুঁজে বই পড়ছে। আমি যে তার দিকে তাকিয়ে আছি সেটা হয়তো সে বুঝতেও পারছেনা। যেমন আমি বুঝতে পারছিনা তিনি বই পড়ছেন নাকি গান শুনছেন। আমার তাকিয়ে থাকায় ব্যাঘাত ঘটালো কন্ডাক্টর। আমার পাশে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার হাত ধরে হাতের আঙুল ফুটাতে শুরু করলাম। হাতের পাঁচটা আঙুল টেনে টেনে পটপট শব্দে ফুটিয়ে দিলাম। আশেপাশের সিটের লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কন্ডাক্টর নিজেও চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। পাশ থেকে লাবণ্য বললোঃ
–আপনি করছেন টা কি? সমস্যা কি আপনার?
আমার সমস্যা কি সেটা বড় কথা না। বড় কথা হলো সুন্দরীর নাম মনে পড়েছে। তার নাম লাবণ্য। আমি হাসি মুখে লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে বললামঃ
-তোমার নাম লাবণ্য তাইনা।
লাবণ্য আমার কথায় খুব একটা গুরুত্ব দিলোনা। তার ব্যাগ থেকে টাকা বের করে বললোঃ
–উনার হাত ছাড়ুন। উনি বাস ভাড়া নেয়ার জন্য হাত বাড়িয়েছেন।
কন্ডাক্টর সাহেবের হাত ছেড়ে দিলাম। বাস চলছে আপন গতিতে। লাবণ্য তার হেডফোন আর বই নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ গাড়ি কষে ব্রেক করলো। সামনে এক্সিডেন্ট হয়েছে। রাস্তা বন্ধ। আমি বাস থেকে নামলাম দেখার জন্য গাড়ির কতো লম্বা জ্যাম লেগেছে। বিরাট লম্বা লাইন। ছাড়তে সময় লাগবে। আবার বাসে উঠলাম। লাবণ্য আমার দিকে তাকিয়ে বললোঃ
–ঘটনা কি বাস থেমে আছে কেন?
.
-সামনে লোকজন খুশি ড্যান্স করছে তাই রাস্তা বন্ধ।
.
–মানে কি? কিসের খুশি?
.
-যে খুশিতে আপনি সেজেছেন। বসন্ত আগমনের খুশি।
.
–আশ্চর্য লোকজন তাই বলে রাস্তার মাঝখানে নাচবে?
আমাদের কথার মাঝে সাইকেল চালালেন কন্ডাক্টর সাহেব। তিনি লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ
–আপা সামনে এক্সিডেন্ট হইছে তাই রাস্তা বন্ধ। বালুর ট্রাক পাল্টি খাইছে। লোক মরে নাই।
.
অনেকক্ষন ধরে বসে আছি। রাস্তা বন্ধ কখন ছাড়বে বুঝতে পারছিনা। লাবণ্য বললোঃ
–এখান থেকে আর কতোদূর?
.
-চলে এসেছি প্রায়। চলুন বাকি রাস্তাটুকু হেঁটে যাই। বসে থেকে লাভ হবেনা। এ জ্যাম দু তিন ঘন্টার আগে ছাড়বেনা।
.
লাবণ্য আমার কথা শুনে কিছু একটা ভাবলো। তারপর বললোঃ
–আচ্ছা চলুন।
দুজনের বাস থেকে নামলাম। এক মিনিট হাঁটতে না হাঁটতে সব গাড়ি চলতে শুরু করলো। কিছুক্ষনের মধ্যে জ্যাম ক্লিয়ার। আমরা যে বাসে ছিলাম সেই বাসের হেল্পারকে হাত নেড়ে বললাম “মামা আমাদের নিয়ে যান”। সে দেখেও না দেখার ভান করলো। লাবণ্য খুব রাগি দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি দেয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু লাভ হলোনা। তার মুখটা আরো রাগী মনে হলো। একটা রিকশা নিয়েছি। মাঝখানে চার আঙুল পরিমান জায়গা ফাঁকা রেখে দুজনে বসেছি। বাসার কাছাকাছি চলে এসেছি। আমি লাবণ্যের ব্যাগ থেকে পানির বোতল থেকে তার মাথায় পানি ঢেলে দিলাম। লাবণ্য চিৎকার দিয়ে উঠলোঃ
–আপনি করছেন টা কি? সমস্যা কি আপনার?
.
-আপনার মাথায় যে ফুলগুলো দিয়েছেন। সারাদিনের রোদে ফুলগুলো শুকিয়ে গেছে তাই পানি দিলাম।
.
–আর ইউ ম্যাড। নামুন রিকশা থেকে। ভাইয়া কোন পাগলকে পাঠিয়েছে। ইউ আর জাস্ট ডিজগাস্টিং।
.
রিকশা থেকে আমাকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। লাবণ্য একাই চলে গেছে। বড় আপা ফোন করে গালি দিয়েছেন। বলেছেন যতোদিন তার ননদিনী পঞ্চগড়ে থাকবে ততোদিন যাতে তাদের বাসায় ভুলেও না যাই। আমি তবুও তার বাসার দিকে যাচ্ছিলাম কিন্তু শালা পল্টু পাগলা আমাকে আবারো লাঠি দিয়ে দৌঁড়ানি দিয়েছে তাই যেতে পারিনি।
রাতের ঘুমটার পরে নেশা পুরোপুরি কেটে গেছে। চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। দেখি লাবণ্য সুন্দরী রিকশায় এক ছেলের সাথে। চায়ের দোকানে বসে থেকেই ডাক দিলাম “এই যে লাবণ্য শুনছেন”। লাবণ্য আমার দিকে তাকিয়ে রিকশাওয়ালাকে কিছু একটা বললো। বেচারা রিকশাওয়ালা শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে রিকশা টেনে নিয়ে গেলো। আমি বেশি কিছু করিনি। দুলাভাইকে ফোন করে বলে দিয়েছি “ভাই আপনার বোনকে দেখলাম এক ছেলের সাথে রিকশায় করে ক্যান্টিনের দিকে যেতে।
লাবণ্য সুন্দরী পহেলা ফাল্গুন আমার সাথে ঘুড়ে ভ্যালেন্টাই অন্য কারো সাথে তা হবেনা। দিছি প্যাঁচ লাগাইয়া।।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here