ছোট ছোট কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী কোম্পানীগুলোর জুন ক্লোজিং মোয়া

0
2912

ছোট ছোট কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী কোম্পানীগুলোর জুন ক্লোজিং মোয়া

বিসিপিএ বা বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন এসোসিয়েশনের( উৎসঃ বিসিপিএ, ১০ই ফেব্রুয়ারী-২০১৬ প্রকাশিত) হিসাব অনুযায়ী তাদের সদস্য সংখ্যা দেশী ও বিদেশী মিলে প্রায় ২০৮টির মত, কৃষি কাজে কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী কোম্পানী আছে। এছাড়াও বিসিপিএ-এর সদস্য হননি এরকম আরও প্রায় ৯২টির মত কোম্পানী আছে অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে ৩০০টির মত কোম্পানী আছে বলে ধারণা করা হয়, যার মধ্যে ২০-২৫টি বড়, বাকীগুলো ছোট ছোট কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী কোম্পানী। দেশী-বিদেশী সব কোম্পানীগুলোই ডিলার/ হোলসেলার/ডিস্ট্রিবিউটর/রিটেইলার/খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ব্যবসা করে থাকে অর্থাৎ আমি যদি বুঝার জন্য সহজ করে বলি তাহলে ব্যবসায়িক মডেলটি দাঁড়ায়ঃ কোম্পানী থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা থেকে কৃষক। ডিলার/ হোলসেলার/ডিস্ট্রিবিউটর/রিটেইলার/খুচরা বিক্রেতার লাইসেন্স সাধারণতঃ জেলা লেভেলের Department of Agricultural Extension অফিসের Plant Protection Wing প্রদান করে থাকেন, তাতে ধারণা করা যাচ্ছে সারা বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজারের মত রেজিষ্টার্ট খুচরা বিক্রেতা আছে। মূলতঃ এইসব খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমেই কোম্পানীগুলো কৃষি উপকরণ গুলো সরবরাহ করে থাকে এবং শতকরা ৯০-৯৫ ভাগ গ্রামের কৃষক কৃষি কাজের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ যেমন- সার, বীজ , বালাইনাশক ,গৌণ খাদ্য উপাদান ও স্প্রে মেশিনের জন্য তাদের উপর নির্ভরশীল এবং সঠিক পরামর্শের জন্য Sub Assistant Agriculture Officer (SAAO)-এর উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল । অন্যদিকে দেশী-বিদেশী সব ধরণের কোম্পানীগুলোই তাদের ব্যবসার ৯০% এরও বেশী এইসব খুচরা বিক্রেতার উপর নির্ভর করে । কোন কোন কোম্পানী এদেরকে রিটেইলার/খুচরা বিক্রেতা, কেউ কেউ ডিলার, আবার কেউ কেউ ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ করে থাকেন। এইসব ডিলারগণ বিভিন্ন কোম্পানীর কাছ থেকে ফসলের মৌসুমের পূর্বে , যেমন- আলুর মৌসুমের পূর্বে আলু চাষের যাবতীয় উপকরণ, বোরো, আমন ও আউশ ধানের মৌসুমের পূর্বে ধান চাষের বিভিন্ন কৃষি উপকরণ, তেমনিভাবে ; পেঁয়াজ, আদা-রসুন, শাকসবজি ও ভূট্রা চাষের পূর্বে বিভিন্ন ধরণের বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বাকীতে নিয়ে থাকেন। প্রতিটি ডিলার মৌসুমের শুরুতে গড়ে ৪-৫টি কোম্পানীর প্রোডাক্ট নিয়ে থাকেন। যেমন- মুখ্য ও গৌণ খাদ্য উপাদান, ছত্রাকনাশক, কীটনাশক, বীজ ও স্প্রেয়ার মেশিন অর্থাৎফসল ভালোভাবে তোলার জন্য যা যা দরকার প্রায় সবকিছুই বাকীর মাধ্যমে নিয়ে থাকেন। প্রতিটি ডিলার, প্রতিটি কোম্পানীর কাছ থেকে গড়ে ৪-৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বাকী বা ক্রেডিট নিয়ে থাকেন। তাহলে একেকটি ডিলার প্রায় ৪x৪ -৫x৫‍ = ১৬-২৫ লক্ষ টাকার প্রোডাক্ট বাকী বা ক্রেডিট পেয়ে থাকেন যা বিভিন্ন কোম্পানীগুলো তাদেরকে দিয়ে থাকেন। এইসব ডিলারদের বেশীর ভাগ পেমেন্ট দেওয়ার সময়কাল সাধারণতঃ বছরে দুই বার থাকে, যাকে সব কোম্পানীগুলো জুন ও ডিসেম্বর ক্লোজিং বলে থাকে। তবে জুন ক্লোজিং সবচেয়ে বেশী গুরত্ব সহকারে কোম্পানীগুলো বিবেচনা করে থাকে। কৃষকরা সাধারণতঃ তাদের প্রধান ফসল ধান, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ , রসুন ও ভূট্রা বিক্রি করে ডিলারদের টাকা পরিশোধ করে থাকেন। এই কারণে ডিলাররা জুন মাসে হালখাতার নামে বা জুন ক্লোজিং এর নামে কৃষকদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পন্থা অবলম্বন করেন এবং কোম্পানীগুলোকে জুন ক্লোজিং নামে মিথ্যা আশ্বাস বা মোয়া ঝুলিয়ে রাখেন । এইসব অসাধু ডিলারগণ( মুষ্টিমেয় কিছু বাদে) কোম্পানীগুলোকে টাকা পরিশোধ না করার কতগুলো কৌশল অবলম্বন করেন।

কৌশলগুলি হলোঃ
১. হালখাতায় উত্তোলনকৃত টাকা দিয়ে লুকিয়ে জমি কেনা
২. দোকানের পজেশন নেওয়া
৩. পাঁকা বাড়ীর কাছ শুরু করা
৪. ভাই-বোনের চাকুরীর জন্য টাকা ঘুষ দেওয়া
৫. গরু কিনে মোটা তাজা করণ
৬. সিসি লোন এডজাস্ট করা
৭. ব্রিকফিল্ড তৈরীর জন্য আত্মীয়কে টাকা দেওয়া
৮. পুকুর খননের কাজে টাকা ব্যয় করা
৯. রড-সিমেন্টের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া
১০. নতুন করে পাশে মুদির দোকান দেওয়া
১১. ছেলে-মেয়েকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর জন্য আগাম টাকা দিয়ে দেওয়া
১২.ছোট ভাইকে বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকা দেওয়া ইত্যাদি ।

এইসব অসাধু ডিলারগণ হালখাতার দিনে কোম্পানীর প্রতিনিধিকে বাকী বা বকেয়া বা ক্রেডিটের টাকা পরিশোধ না করার জন্য কতগুলি মিথ্যা কথা সত্যের আদলে বলে, যেমন-
১. আমার হালখাতা ২-৩ দিন ধরে হবে, আপনি অমুকদিন আসেন
২. অনেক সময় কোম্পানীর লোককে না জানিয়ে হালখাতা করা
৩. হালখাতার দিনে টাকা দেওয়ার নিয়ম নাই বলে প্রচারণা চালানো
৪. একেক কোম্পানীকে একেক কথা বলা ৫. হালখাতায় বর্তমান কোম্পানীগুলোকে টাকা না দিয়ে, অন্য নতুন নতুন কোম্পানীগুলোর সাথে ব্যবসা শুরু করার ফন্দি আঁটা
৬. হালখাতার টাকা সিসি লোন এ এডজাস্ট করে কালকে দিবো বলে, কোম্পানীর প্রতিনিধিকে চলে যেতে অনুরোধ করা
৭. হালখাতার পরের দিন অন্যখানে বেড়াতে যাওয়া ও মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা
৮.হালখাতার দিনে নিজের আত্মীয়কে দোকানে বসিয়ে চালাকি করে ক্লিনিকে ভর্তি হওয়া
৯. রাতারাতি মোবাইল ফোন চেঞ্জ করে ফেলা
১০. হালখাতা শেষে হঠাৎ বড় অসুখ ধরা পরেছে বলে ঢাকা চলে যাওয়া
১১. বাপ-বেটার মধ্যে কৃত্রিমভাবে ঝগড়া শুরু করা
১২. ব্যাংকের লোন হয়েছে ,কালকে তুলে দিয়ে দিবো বলে মিথ্যা কথা বলা ১৩.একাউন্টে টাকা না রেখে বেয়ারার চেক দেওয়া
১৪. জমি বন্ধকের টাকা পাবো বলে মূলা ঝুলানো
১৫. টাকা পরিশোধের পূর্বে বিভিন্ন খান থেকে অবিক্রিত প্রোডাক্ট দোকানে এনে, প্রোডাক্ট বিক্রি হয়নি বলে টাকা না দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করা
১৬. আপনাদের বিষ বা প্রোডাক্ট বা বীজ কাজ করেনি বলে ইস্যু তৈরী করা
১৭. ধান ও ভূট্রা মিলারদের দিয়ে একটিও টাকা পায়নি বলে অজুহাত দেখানো
১৮. হঠাৎ দোকান বন্ধ করে নিরুদ্দেশ হওয়া
১৯. লোকাল নির্বাচনে সহায়তা করার জন্য পুলিশি মামলা খাওয়া ও পালিয়ে বেড়ানোর অজুহাত
২০. রাত ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত হালখাতায় কৃষকদের আসতে বলা যাতে কোম্পানীর লোক থাকতে না পারে এবং পরের দিন দোকান বন্ধ রাখা
২১. হালখাতা ভালো হয়নি এবং এনজিও থেকে হয়ে যাওয়া লোন পেলাম না বলে দুঃখ প্রকাশ করা
২২. হালখাতার তারিখ কোম্পানীর লোককে জানানো এবং গোপনে ঐদিন বড় বড় কৃষককে দোকানে না আসতে বলা এবং পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা তুলে নিয়ে আসা
২৩. ঝর -বৃষ্টির কারণে হালখাতা ভালো হয়নি এবং আমি নিঃশেষ হয়ে গেলাম বলে আহাজারি করা
২৪. ভাই একটু পরে আসেন বলে বাড়ি চলে যাওয়া এবং আর না আসা
২৫. পেমেন্টের আগের দিন পুলিশি কেস খাওয়া
২৬. ব্যাংক লোন করার নামে ব্যাংকের ম্যানেজারকে হাত করে কোম্পানীর লোককে আশ্বস্ত করা
২৭. হিসাব করা টাকা বাড়িতে রেখে এসে, বউ টাকা নিয়ে নিয়েছে আর দেয় না বলে দুঃখ প্রকাশ করা
২৮.একবার হালখাতা করে, পরে আর একবার হালখাতা তারিখ ঠিক করা, শুধুমাত্র কোম্পানীর লোককে মোয়া দেখানোর জন্য
২৯. ধানের ফলনের অর্ধেক অংশ কামলায় নিয়ে যাওয়া, ফলে কৃষক তাদেরকে টাকা না দেওয়া
৩০. পেমেন্টের আগের দিন কোন আত্মীয়-স্বজন মারা গেলে, সেটাকে অজুহাত হিসাবে দেখিয়ে টাকা না দেওয়ার পাঁয়তারা করা।

এইভাবে ডিলারগণ কোম্পানীর লোককে জুন ক্লোজিং মোয়া ঝুলিয়ে থাকেন।
কী করলে আমরা জুন ক্লোজিং মোয়া থেকে রক্ষা পাবো
১.সকল কোম্পানীকে বিষয়টি নিয়ে গুরত্বের সহিত বিবেচনা করা
২. ক্রেডিটের টাকা পরিশোধ না করলে যৌথ ভাবে একশনে যাওয়া বা লিগা্ল প্রসেস অবলম্বন করা
৩. বিষয়টি সব কোম্পানীকে বিসিপিএ-এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া ৪.কেউ লিগা্ল একশন নিলে সহায়তা করা
৫. ডিলারশিপ দেওয়ার আগে অন্যান্য কোম্পানীর সমস্ত ড্যাটা নেওয়া এবং ঐসব কোম্পানীর সাথে মিলিয়ে দেখা।
বিসিপিএ বা বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন এসোসিয়েশনের ভূমিকাঃ বিসিপিএ এই ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন-
১. টাকা পরিশোধের জন্য, দুষ্ট প্রকৃতির ডিলারদের বিসিপিএ প্রেসার ক্রিয়েট করতে পারে , টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোন কোম্পানী যেন নতুন করে প্রোডাক্ট দিতে না পারে, তার জন্য কোম্পানীকে সতর্ক করতে পারে
২. যদি এক বছরের মধ্যে টাকা না দেয় তাহলে সব কোম্পানীকে ঐসব ডিলারদের বিস্তারিত ঠিকানা ও ছবি সহ চিঠি দেওয়া, যাতে সে আর অন্য কোন কোম্পানীকে ঠোকাতে না পারে। এইভাবে উপরিল্লিখিত বিষয়গুলি এক্ষুনি যদি আমরা গুরুত্বের সহিত বিবেচনা না করি তাহলে ছোট ছোট কোম্পানী বা ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোগতারা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিনে দিনে নিঃশেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে ডিলারগণ জুন ক্লোজিং-এর মোয়া দেখিয়ে কিছু কোম্পানীকে ঠকিয়ে আরো নতুন কোন কোন কোম্পানীর প্রোডাক্ট নিয়ে বিনা পয়সায় ব্যবসা করে,এল.ই.ডি টিভি, ফ্রিজ,এপ্যাঁচি মোটর সাইকেল,বাড়ি , জমি-জায়গা, নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করে ও দোকান কিনে মহা আনন্দে দিন কাটাবে ।আর কোম্পানীগুলো জুন ক্লোজিং মোয়ার আশায় তাদের দোকানের দরজায় একশবার ঘুরে ব্যর্থ হবে। আশা করি সব কোম্পানীগুলো বিষয়টি অনুধাবন করবেন এবং ডিলারদের জুন ক্লোজিং মোয়ার বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন, এটিই আমার প্রত্যাশা।

লেখক :
কৃষিবিদ মো: আববাস আলী
পরিচালকঃ সেলস এন্ড মার্কেটিং, ম্যানেজিং পার্টনার
এক্সপ্লোর বিজনেস লিমিটেড।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here