বিদেশ গমন বনাম টমেটো চাষ

0
1288

বিদেশ গমন বনাম টমেটো চাষ

– কৃষিবিদ মোঃ আববাস আলী

২০১৮ সালের প্রথম ৮ মাসে প্রায় ৩ লক্ষ বাংলাদেশী মধ্যপ্রাচ্যে গিয়েছিল (উৎসঃ ঢাকা ট্রিবিউন, ২৬‌‌‌ আগষ্ট‌,২০১৯)। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বহু অল্প শিক্ষিত তরুণ সৌদি আরব, ইউএই,কুয়েত, কাতার,ওমান, জর্দান, লেবানন ও বাহরাইনে যায়। এই সব দেশে যেতে প্রায় ৫ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা থেকে ৬ লক্ষ টাকার মত লাগে। যাওয়ার সময় তাদের প্রত্যাশা থাকে মাসে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা বেতন পাবেন, কিন্তু বাস্তবে সেখানে তারা পায় ২৫-২৬ হাজার টাকা। অনেক সময় তাদের থাকা ও খাওয়াও মিলে না, ভীষণ কষ্টে দিনযাপন করে । আমরা মোটা- মুটি সবাই জানি, এইসব তরুণ তাদের নিজের বাবার জমি, দোকান বিক্রি করে, অনেক সময় আত্মীয়-স্বজন বা গ্রামের মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে অথবা টাকা ধার-দেনা করে, অনেক সময় জীবনের শেষ সম্বল টুকু বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে বিদেশে যায়, একটি স্বপ্ন নিয়ে, একটু সুখের আশায়। যখন ওখানে গিয়ে কোন ভালো চাকুরী বা কর্মসংস্থান হয় না,হলেও নিজেদেরই চলে না, কিভাবে তারা বাড়িতে নিজের বাবা-মা, ভাই-বোনদের টাকা পাঠাবে, সেই সাথে আছে মহাজনের টাকার চড়া সুদের মাসিক কিস্তি , যা তাদের মস্তিকের উপর বিশাল চাপ তৈরী করে। এর পর আছে আরও অনেক প্যারা যেমন-যখন তখন চাকুরী যাবার ভয়,কারণ দালালদের কারণে অনেক সময় বৈধ ভিসা থাকে না, অনেক সময় ওয়ার্ক পারমিট থাকে না, জেল খাটার ঘটনা তো প্রায় শুনা যায়, সেই সাথে আছে নানা রকম দূর্ঘটনা যেমন-সড়ক দূর্ঘটনা, উঁচু ভবন থেকে পরে যাওয়ার দূর্ঘটনা, আগুন লাগার ঘটনা ইত্যাদি। আরো কিছু অমানবিক ঘটনা আছে যেমন-ছাগল ভিসা নিয়ে যাওয়া , মানে ধুধু মুরুভুমিতে মাসকে মাস ধরে ছাগল চড়াতে হয় বলে অনেকে একে ছাগল ভিসা বলে,অনেকে ১২ ঘণ্টা ডিউটি করার পর, আবার ষ্টোর পরিষ্কার করে,অনেকে ভিক্ষা করে শুধুমাত্র ৫০০ অতিরিক্ত রিয়েলের অর্জনের জন্য। এতক্ষনে হয়তো আপনারা ভাবছেন বিদেশ গমনের সাথে টমেটো চাষের সম্পর্ক কী। আসলে আমি একজন কৃষিবিদ হিসেবে এই বিষয়টিকে যেভাবে দেখি, সেটাই লেখার চেষ্টা করছি। ধরা যাক, রাজশাহীর জেলার পবা ও গোদাগারী উপজেলা, দিনাজপুরের সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলা, কুমিল্লার জেলার চান্দিনা , ময়মনসিংহ জেলার সদর উপজেলা , জামালপুর জেলার সদর উপজেলা , কুষ্টিয়ার জেলার মিরপুর এবং পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার একজন অল্প শিক্ষিত তরুণের পৈত্রিক ভাবে পাওয়া ১ বিঘা জমি যদি থাকে( ৩৩ শতাংশ), সে যদি বিদেশ গমনের চিন্তা বাদ দিয়ে, এই ১ বিঘা জমিতে যদি টমেটো চাষ করে তাহলে তার কী অবস্থা দাঁড়ায়। ১ বিঘা জমিতে উন্নত জাতের টমেটো চাষ করতে হলে উল্লেখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হয় যেমন- জমি তৈরী,সার, উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ, চারা তৈরী, মূল্ জমিতে লাগানো, আন্তঃপরিচর্যা, ষ্টেকিং বা কাঠি দেওয়া, প্লাস্টিকের দড়ি কেনা, সেচ দেওয়া, প্লাকিং বা ফসল তুলার জন্য লেবার সংগ্রহ, গ্রেডিং করা ও লোকাল আড়ত পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। ১ গ্রাম টমেটো বীজে থাকে ২৫০টি বীজ, ১টি বীজ মানে ১টি টমেটো গাছ আর ১টি টমেটো গাছ মানে ৬ কেজি টমেটো। ১ বিঘা জমিতে টমেটো বীজ লাগবে ২০ গ্রাম বীজ অর্থাৎ ২০ x২৫০টি বীজ সমান ৫,০০০টি টমেটো গাছ । ১০%গাছ বিভিন্ন কারণে মারা গেলেও( ১০% মানে ৫০০টি গাছ) আরো থাকে ৫০০০ -৭৫০= ৪৫০০টি গাছ । তাহলে মোট ফলন হয় ৪৫০০টি গাছ x৬ কেজি (প্রতিটি টমেটো গাছে গড়ে যদি ৬ কেজি টমেটো হয় )= ২৭,০০০ কেজি টমেটো,এটাকে যদি ৪০কেজি দিয়ে ভাগ দিই, তাহলে ফলন হয় ৬৭৫ মন। আগাম জাতের ১কেজি টমেটোর দাম কম পক্ষে ৬০ টাকা। তাহলে ২৭,০০০ কেজি x ৬০ টাকা = ১৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। আমরা যদি খরচ বাবদ ৩০ হাজার টাকা,তার শ্রমের মূল্য মাসে ১৫ হাজার টাকা ধরি,তাহলে ৪ মাসে= ৬০হাজার টাকা( কারণ আগাম জাতের টমেটো সারে তিন মাসে উঠে যায় অর্থাৎ ১০৫ দিনের ফসল,চারাতে লাগে= ২৫ দিন, ফল আসতে সময় লাগে= ৬০ দিন এবং ফল তুলতে সময় লাগে ২১ দিন, তাহলে মোট দিন হয়= ২৫+৬০+২১=১০৬দিন,সেখানে আমরা চার মাস ধরলাম)। তাহলে ১ বিঘা জমিতে মোট হচ্ছে= ৩০+ ৬০= ৯০ হাজার টাকা। অতএব, ১৬ লক্ষ ২০ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার টাকা বাদ দিলে মোট লাভ হয় = ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। এটাকে ১২ মাসে ভাগ দিলে মাসিক আয় দাঁড়ায় ১লক্ষ ২৭ হাজার ৫শত টাকা, অথচ তার হাতে আরও ৮ মাস সময় রয়ে যাচ্ছে, সেই জমিতে সে অন্যান্য ফসলও করতে পারবে।

এইভাবে আমাদের দেশের বেকার তরুণেরা যদি সঠিক পরিকল্পনা করে, মানুষের কথায় কান না দিয়ে অথবা পাছে লোকে কিছু বলে, এই ভয় না করে কাজকে কাজ হিসেবে দেখে আর আমরা বা আমাদের সমাজও যদি শ্রমের মর্যাদা দেই অর্থাৎ ঐ ছেলেটিকে যদি কটু কথা না বলি, তাহলে এইসব টগ্‌বগে তরুণদেরকে আর জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করতে হবে না, থাকতে হবে না, প্রিয়তমা স্ত্রী, প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তান, অত্যন্ত স্নেহের ছোট ভাই-বোন, হাড়ভাঙা পরিশ্রমকারী বাবা ও গর্ভধারণী জননীকে ফেলে ৪,৫৮৪ কিলোমিটার দূরে, সুদূর ধুধু মরুভূমিতে নির্ঘুম রাত কাটাতে। বলতে হবে না জেলে থেকে মিথ্যা কথা, প্রিয়তমা স্ত্রী ও গর্ভধারণী মাকে, আমি খুব ভালো আছি, শুনতে হবেনা ৭০- ৮০ তলা ভবন থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর সংবাদ। হতে হবে না প্রতিনিয়ত বিদেশীদের হাতে লাঞ্ছিত। আসলে ছোট্ট এই জীবনে ছোট্ট ১টি স্বপ্ন নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক চললে আমার মনে হয় কোন ময়ের বুক খালি হবে না, বিঁধবা হতে হবে না কোন প্রিয়তমা স্ত্রীকে, বঞ্চিত হতে হবে না আদরের ভাই বোনদের অকৃতিম ভালো বাসা থেকে। তাই আসুন বিদেশ গমনের আগে আমরা যারা বেকার তরুণরা আছি, আমাদের জীবনটাকে আমাদের মত করে সাজাই। কল্পনা বিলাসি না হয়ে, বাস্তব সম্মত কাজ করি, নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমাই, মা-বাবাকে সেবা করি, ভবিষ্যৎ জেনারেশনকে শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করি , টমেটো চাষ করলে গ্রামের মানুষ কী বলবে এসব কথা না শুনার জন্য কানে তুলো দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই, দেশ, মাটি, মানুষ ও লাল সবুজের পতাকার সাথে নিজেকে সঁপে দিয়ে,আত্মসম্মান বোধ নিয়ে চলা ফেরা করি। পাঠক ভায়েরা আপনারা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন বিদেশ গমন বনাম টমেটো চাষের সম্পর্ক। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ না করে, টমেটো বা সব্জী চাষ করে সহজে মাসে লাখ টাকা আয় করা যায়, যার শত শত উদাহরণ আছে আমাদের দেশে।

তাই আসুন অজানা দেশে আলাদিনের চেরাগের স্বপ্ন না দেখে, আমাদের দেশে আমরা নিজেরাই নিজেদের পায়ে দাঁড়াই, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। সব শেষে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপ্রতি এ পি জে আব্দুল কালামের একটি উক্তি দিয়ে শেষ করি- “স্বপ্ন সেটা নয় যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন সেটা যেটা তোমায় ঘুমাতে দেয় না”। সুতরাং ভালো করার সবচেয়ে কার্যকরি সূত্র হলঃ KAP, K=Knowledge, A=Attitude and P=Practice. অর্থাৎ জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধৈর্যসহকারে বার বার চেষ্টা করা, স্বপ্ন পূরণের অন্যতম হাতিয়ার। সুতরাং নিজের গ্রামে, নিজের জমিতে স্বাধীনভাবে টমেটো বা সব্জি চাষ করুন, অদক্ষ হয়ে বিদেশ যাবার জন্য পাগলামী বন্ধ করুন এবং নিজেকে নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী করে তুলুন এটাই আমার আপনাদের কাছে প্রত্যাশা।

লেখকঃ
কৃষিবিদ মোঃ আববাস আলী
পরিচালকঃ এক্সপ্লোর বিজনেস লিমিটেড। 

Facebook Comments