মেঘের আড়ালে চাঁদ

0
749

মেঘের আড়ালে চাঁদ

– নূর ইসলাম আলিফ

চেয়ারে হেলান দিয়ে টেবিলের উপর পা তুলে আরামের ঘুম দিচ্ছিলাম এমন সময় নাকে দামি নারী সুগন্ধির সুড়সুড়ি অনুভব করলাম।
–আলিফ আলিফ
ডাকাডাকি শুনে চোখ মেলে দেখি ভুড়িওয়ালা কাইল্লা বসে টেবিলের উপর নিজের সুবিশাল ভুড়ি ঠেস দিয়ে ডাকছে। বসকে দেখে তাড়াহুড়া করে টেবিল থেকে পা নামিয়ে দাঁত বের করে বললামঃ
.
-জ্বী স্যার
.
–অফিসটা কাজের জায়গা ঘুমানোর জায়গা না।

-সরি স্যার।

–আর এসব কি, চুল দেখি কাঁধ পেরিয়ে গেছে। বৌয়ের সাথে কম্পিটিশনে নেমেছেন বুঝি। দেখুন আমার অফিসে এসব চলবেনা চুল কেটে ফেলবেন।

-স্যার আপনি যে আপনার বৌয়ের পার্ফিউম মেখে আসেন তা নিয়ে তো আমি কমপ্লেইন করিনি। নকল চুলে চিরুনি ব্যবহার করেন তাতেও আপত্তি জানাইনি।

–বসদের সাথে তর্ক ক্যারিয়ারের জন্য খারাপ।

-সালা তোর অত্যাচারে জীবন ত্যানা ত্যানা হয়ে গেলো। বাসায় বৌ খ্যাচখ্যাচ করে এখানে তুই। এক গাদা ফাইল টেবিলের উপর রেখে যাস। তুই আসার পর গত একমাসে শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। রাতে স্বপ্নেও তোরে দেখি। পিঙ্ক শার্ট পড়ে নাকে আঙুল দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকিস।
.
–শ্যাট আপ…
.
-তুই শ্যাট আপ।
.
–ইউ আর ফায়ার্ড…
.
-তোর চাকরির নিকুচি করি।
.
টেবিলের উপরের গ্লাসটা আছাড় দিলাম। ততোক্ষনে পুরো অফিস সেখানে জড়ো হয়েছে। বস রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেনঃ
.
–বেড়িয়ে যা, এক্ষুনি বের হ। নাহলে গার্ড ডেকে ডাস্টবিনে ফেলে দিবো।
.
-শালা খবিস তোর এত্তো বড় সাহস।
.
বসের নকল চুল টেনে নিয়ে টাক মাথায় সজোরে হাতের তালু দিয়ে তালি মারলাম। থপাশ করে শব্দ হলো, বস আউ করে শব্দ করলেন।
তারপর আর কি গার্ড এসে স্বসন্মানে আমাকে চ্যাংদোলা করে গেটের বাইরে রেখে আসলো।
.
দুমাস পেরিয়ে গেছে এখনো আমি বেকার। সারাদিন ঘুম দেই। বৌ খ্যাচখ্যাচ করে আমি কানে তুলো গুঁজে রাখি। সংসার কিভাবে চলছে জানিনা তবে আমি বেশ আছি।
টিভিতে স্টুপিড সো দেখছি আর হাসছি। এক মটু ফটোকপি মেশিনের উপর প্যান্ট খুলে বসে নিজের পাছার কপি করতে গিয়ে মেশিন ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকে গেছে সেটা দেখে হাসছি এমন সময় বেলন হাতে বৌ রকেট গতিতে ঘরে ঢুকে হাতের রিমোটটা কেড়ে নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিলো।
.
-টিভি বন্ধ করলে কেন?
.
–মুহি পাশের রুমে রেহার্স করছে।
.
-কিসের রেহার্স?
.
–গানের।
.
-তো?
.
–তোমার হাসিতে ওর ডিস্টার্ব হচ্ছে।
.
-তো আমি কি করবো?
.
–কেন সারাদিন মেয়ে মানুষের মতো বসে না থেকে চাকরির খোঁজ তো করতে পারো। অনেকদিন তো হলো আর কতো আরাম করবে। আপনার যে বৌ বাচ্চা আছে সে খেয়াল আছে?
.
-এতো রেগে আছো কেন?
.
–নাহ্ আনন্দে আছি, বলি সংসার কিভাবে চলছে জানতে চেয়েছো?
.
-না।
.
–না মানে?
.
-না মানে নো, নেহি, না।
.
–বাহ্ খুব ভালো, এই নাও আমার চুড়ি। হাতে পরে বসে থাকো। মাথা সামনে আনো চুলে বেনি করে দেই।
.
-মানে কি?
.
–তোমায় নিয়ে লোকে কতোকিছু বলে, ঠাট্টা তামাশা করে সেটা কি চোখে পড়েনা?
.
-মানুষের বিনোদনের বড়ই অভাব। ব্যস্ত জীবনে তাদের একটু বিনোদন দিচ্ছি তাতে ক্ষতি কি?
.
–বিনোদন দেয়ার এতো ইচ্ছে থাকলে ক্লাউন সেজে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকো। এই মুহূর্তে চোখের সামনে থেকে দূর হও।
.
-সরি আমি একটু ঘুমাবো।
.
কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুইছি বৌ এসে কাঁথায় পানি ঢেলে দিলো। মেজাজটা বেজায় বিগড়ে গেলো। ইচ্ছে করছিলো বৌ কে ওয়াশিং মেশিনে ঢুকিয়ে হারপিক দিয়ে ওয়াশ করতে কিন্তু তাহা সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে জ্যাকেটটা পড়ে বের হলাম। বের হওয়ার আগে মুহির রুমে ঢুকলাম।
মোটকি এক মহিলা চোখ বন্ধ করে হারমনিয়াম নিয়ে সারেগামাপা সারেগামাপা করছে, আর মুহি হাতে বিস্কুটের টুকরা নিয়ে মহিলার হা হওয়া মুখ বরাবর নিশানা করছে। মহিলার মুখটা আরেকটু হা হতেই মুহি বিস্কুটটা ছুড়ে মারলো। মাশাআল্লাহ্ বিস্কুট সোজা মহিলার মুখে। মেয়ের প্রতিভায় আমি মুগ্ধ। ইনশাহ্আল্লাহ্ মেয়ে বড় হয়ে তীর নিক্ষেপে দেশকে গোল্ড মেডেল এনে দিবে।

আমি হাঁটছি। গন্তব্য চাচার বাড়ি। চাচা গত সপ্তাহে বিদেশ থেকে রিটায়েট করে ফিরেছেন। দুদিন আগে বাসা এসে বললেনঃ

–আলিফ শুনলাম তোমাকে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে, বেকার মানুষ। তুমি কিছু মনে না করলে আমার এসিসটেন্ট হতে পারো। কাজ নেই। সারাদিন আমার সাথে সাথে ঘুরবে, দুপুরের খাওয়া ফ্রি। রাতে হাজার টাকা নিয়ে বাসা ফিরবে। বেতন দৈনিক এক হাজার দেয়া হবে। শুক্রবার অফ ডে।

সেদিন চাচা কথা শুনে বিরাট হাই তুলে কম্বলের ভিতরে ঢুকে পড়েছিলাম। আজ গিয়ে দেখি চাকরির অফারটা আছে নাকি গেছে।

কপাল গুনে চাচা বাসায় ছিলেন। আমাকে দেখি প্রশস্ত হাসি দিয়ে বললেনঃ

–আমি জানতাম তুমি আসবে। চলো বের হতে হবে। যেহেতু দুপুরে এসেছো আজ অর্ধেক বেতন পাবে।

আমার কাজ তেমন কিছু না, চাচার চামরার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে চাচার এসি কারে ঘুড়ে বেড়ানো। বিভিন্ন মানুষের বাসায় গিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়া আর ফেরার সময় ব্যাগ খুলে টাকা চাচার হাতে বের করে দেয়া।

অনেকক্ষন যাবত সোফায় বসে আছি, পা তুলে বসতে পারলে ভালো হতো কিন্তু চাচা বারন করেছেন। যার জন্য অপেক্ষা করছি তিনি বাসায় ফেরা মাত্র তাকে দেখে একটু ধাক্কা খেলাম। তিনি হলেন আমার লেডিস পার্ফিউম ব্যবহারকারি প্রাত্তন বস। আমাকে দেখেই বেচারা নকল চুল টেনে শক্ত করে বসিয়ে দিলেন।
.
–তুমি এখানে?
.
-না স্যার আমি প্যান্ট খুলে বাসার টয়লেটে বসে আছি, আপনি আমাকে কল্পনায় দেখছেন।
.
–চুপ ফাজিল এখানে কি তোমার? কোন সাহসে আমার বাসায় ঢুকেছো?
.
-আমার নতুন বসের সাথে এসেছি। উনি ভেতরের বসার রুমে।
.
–কে সে?
.
-আমার চাচা হন, বর্তমানে বস।
.
–গাধা আমি তার নাম জানতে চেয়েছি।
.
-বদনা আলি।
.
–কিহ্?
.
-পরিবারের সবাই তাকে এ নামেই ডাকেন। ছোটবেলায় চাচার সারাক্ষণ পেট খারাপ থাকতো বদনা নিয়ে দৌঁড়াদৌঁড়িতে তার বিশেষ পারদর্শিতা ছিলো যার কারনে তার নাম বদনা আলি।
.
–ফাইজলামি করো আমার সাথে। তার ভালো নাম কি?
.
-ভালো নাম নেই।
.
–মানে কি?
.
-তার নামটা আমার পছন্দ না, দাদায় নাম রাখার সময় তেমন চিন্তা করেননি তাই যেমন তেমন নাম রেখেছেন।
.
–স্টপ টকিং রাবিশ্
.
-অক্কে।
.
চাচা নিচে চলে গেছেন আমি বসার রুমে বসে আছি। বস এসে বললেনঃ
.
–তুমি যাওনি?
.
-না।
.
–কেন?
.
আমি কথার জবাব না দিয়ে বসের নকল চুল টেনে দৌঁড় দিলাম। বস আমার পিঁছু পিঁছু দৌঁড় দিলেন, দরজার কাছে আসতেই ধাড়াম শব্দে বস পড়ে গেলেন। ঘটনা হলো বস আসার আগে বারান্দায় রাখা বসের দুই জুতার ফিতা একসাথে বেঁধে দিয়েছিলাম। জুতো পড়ে দৌঁড় দিতে গিয়ে বেচারা আছাড় খেয়েছে। জুতো না পড়লে অবশ্য আছাড়টা খেতোনা।

কার এসে থামলো বারের সামনে। চাচা মদ খান জানতাম না। চাচা আমার হাতে এক হাজার দিয়ে বললেনঃ
.
–প্রথম দিন তাই পুরোটাই দিলাম।
.
-আপনি মদ খান?
.
–নাহ্… আসলে এই জায়গাটা অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। মানুষের ভিড়ে থাকা যায়। বাসা গেলে একা থাকতে হয়। একা জীবন বড়ই ভয়ংকর। টাকা দিয়ে একাকিত্ব দূর করা যায়না।
.
-চাচা আপনি দ্বিতীয় বিয়ে করলেননা কেন?
.
–রেহানার জায়গাটা অন্য কাউকে দিতে পারবোনা তাই।
.
-যেই মহিলা আপনাকে ছেড়ে অন্যকারো হাত ধরে পালিয়ে গেছে তারজন্য এতো ত্যাগ কেন চাচা?
.
–তুই বুঝবিনা।
.
-যেখান থেকে এলাম সেটা নিশ্চই চাচির বাসা?
.
–হুম…
.
-আপনি গেলে তিনি বিরক্ত হন না?
.
–হুম হয়। তবুও যাই। মাঝে মাঝে নির্লজ্জ মনে হয় নিজেকে তবুও যাই। তার ক্ষনিকের দর্শন বেঁচে থাকার ইন্ধন যোগায়।
.
-তার স্বামী কিছু বলেনা?
.
–হুম আজ আমাকে দেখে বাজে বাজে কিছু গালি দিলো।
.
-আমার বাসায় যাবেন?
.
–নাহ্… যা বাসায় যা। রাত হয়েছে। বৌমা অপেক্ষা করছে।
.
মানুষ বড়ই অদ্ভুত। যার যেটা থাকে সেটার কদর করেনা, যার নেই সেই তার কদর বুঝে। চাচার টাকা আছে আপনজন নেই, আমার টাকা নেই কিন্তু আপনজন আছে। বৌয়ের কথা আমার কাছে ঘ্যানঘ্যান, খ্যাচখ্যাচ মনে হয়। মনে হতো বেচেলার লাইফটাই ভালো কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তাকে ছাড়া আমি শূণ্য। তার বকবক ছাড়া কিছুই ভালো লাগছেনা।

অনেকক্ষন ধরে কলিংবেল বাঁজানোর পরে রাত্রি দরজা খুলে দিলো।

-ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
.
–তো কি, তোমার জন্য জেগে থাকবো? কখন আমার পতিদেব রাজ্য জয় করে ফিরবেন আর আমি ফুলের মালা তার গলায় দিবো। সারাদিন ছিলেন কোথায়? বাসা ফেরার কি দরকার ছিলো। বাইরেই থাকতেন।
.
-ঝগড়া করছো কেন?
.
–আমার তো অভ্যাস ঝগড়া করা জানিসনা।
.
-তুই তোকারি করছো কেন?
.
–তো তোকে কি বলবো? আপনি? কতো রাত হয়েছে সে খেয়াল আছে, একটা মানুষ যে না খেয়ে অপেক্ষা করছে। দুশ্চিন্তা করছে সে কথা কি মনে পড়ে?
.
-সরি।
.
–হয়েছে আর ঢং করতে হবেনা। খেয়ে উদ্ধার করেন।
.
খাওয়া শেষে ঘরে গিয়ে দেখি রাত্রি নেই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
.
-ঘুমাবেনা?
.
–তুমি ঘুমাও, আমি পরে ঘুমাবো।
.
-আচ্ছা আজকের চাঁদটা এতো বড় কেন?
.
–যাও তো এখান থেকে ভালো লাগছেনা।
.
পকেট থেকে ফেরার পথে কেনা নূপুরটা বের করে রাত্রির পায়ে পড়িয়ে দিলাম।
.
–কি করছো?
.
-বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধছি।
.
–মানে?
.
-বিছানায় পানি ঢেলে দেয়ার সময় যখন তুমি দৌঁড়ে আসো তখন নূপুড়ের শব্দ শুনে যাতে ভেজার আগেই বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠতে পারি।
.
–আমি চুপিচুপি এসে পানি ঢেলে দিবো। হিহিহি
.
-তোমার হাসিটা এতো সুন্দর কেন?
.
–হইসে আপনাকে আর ঢং করতে হবেনা। আর এভাবে কাঁপছো কেন?
.
-শীত লাগে তো। তোমার চাদরটাতে একটু জায়গা দাও।
.
–আগে মাথা থেকে বানর টুপিটা খুলো।
.
মাথা থেকে টুপি খুলতেই রাত্রি মুখ হা করলো।
.
–ই মা তুমি চুল কেটে ফেলছো?
.
-হুম… খুশি হয়েছো?
.
–অনেক অনেক অনেক খুশি হইছি। উম্মা। দাঁড়াও মুহিকে ডেকে তুলি ও দেখলে অনেক মজা পাবে। মুহি মুহি মুহি………
.
গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। ভালোবাসার মানুষকে খুশি করতে বড় বাড়ি দামি গাড়ি লাগেনা। তারা ভালোবাসা পেলেই খুশি হয়। চাঁদটার প্রতি মায়া হয়। বেচারা কতো একা। সবাইকে আলো বিলিয়ে একা চেয়ে চেয়ে সবার সুখ দেখে। না শুধু সুখ দেখেনা, চাচার মতো কিছু মানুষের চকচক করা চোখের জল ও দেখে।
আমার ঘুম পাচ্ছে কিন্তু ঘুমানো সম্ভব না। মুহি কোলে ঘুমাচ্ছে আর রাত্রি কাঁধে মাথা দিয়ে। আমি মুর্তির মতো বারান্দায় বসে চাঁদ দেখছি। মনে হচ্ছে বিছানা, কোলবালিস আর কাঁথা আমাকে ডাকছে। এ কোন যন্ত্রনায় পড়লাম। বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গেলে বিপদ তিনজনে একসাথে ধপাস।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here