রাত্রি

-এন. আই আলিফ

0
259

ইদানিং মন মেজাজ খারাপ, কেউ লিখা ছাপাতে চাচ্ছেনা। ফোন করলে ফোনটাও ধরেনা, বলে আগের বইটা মাত্র দশ কপি বিক্রি হইছে। এদিকে টাকা পয়সা নেই তার উপর রাত্রির বকবক, মুহির স্কুলের টাকা, বাজার খরচ, অমুক তমুক শুধু টাকা টাকা আর টাকা। টাকা ছাড়া যেন কোন কথা নেই। এসব আর ভালো লাগেনা ইচ্ছা করে সংসার ছেড়ে জঙ্গলে চলে যাই।
.
এতো সমস্যার মধ্যে গতকাল আরেক সমস্যা এসে হাজির হয়েছে। কোন দূর সম্পর্কের খালা। কাল থেকে মাথা খেয়ে ফেললো। কথায় কথায় রাত্রির ভুল দোষ বের করে শোনাচ্ছেঃ
.
–তোর বৌ রান্না পারেনা, সংসারি না, বড়দের সন্মান করতে জানেনা, ব্লা ব্লা ব্লা। আমার মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চাইলাম করলিনা। সাদা চামড়া দেখে বৌ আনলি এখন বুঝ মজা।
.
-খালা যা হবার হইছে, যান টিভি দেখেন।
.
–সেটা তো বলবি বৌয়ের আঁচল ধরে বসে থাক।
.
-খালা প্লিজ।
.
খালা রুম থেকে বের হতেই কিছুক্ষন পরে রাত্রি এসে রুমে ঢুকলোঃ
.
–রুমটাকে করেছো কি?
.
-কি করেছি?
.
–তোমাকে কতোবার বলেছি রুমের মধ্যে সিগারেট খাবেনা। সারা রুমে সিগারেটের টুকরা ফেলে রাখছো।
.
-উঁফ…
.
–হুম উঁফ তো বলবাই। আমি পুরোনো হয়ে গেছিনা, এক কাজ করো তোমার খালার মেয়েকে বিয়ে করো। আমাকে বাবার বাসায় রেখে আসো।
.
-খালা কিছু বলেছে?
.
–বলতে কিছু বাকি রেখেছে?
.
-বাদ দাও মুরুব্বি মানুষ।
.
–টাকা দাও…
.
-নেই।
.
–থাকবে কিভাবে চাকরি ছেড়ে সারাদিন কাগজ-কলম নিয়ে বসে থাকো। এভাবে সংসার চলে, বাসায় বাজার নেই মেহমানদের কি খাওয়াবো?
.
-কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করিওনা তো। যাও ভাগো।
.
রাত্রি হনহন করে অন্যরুমে চলে গেলো, কিছুক্ষনের মধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে আসলো। ওর এটাই অভ্যাস একটু কি হলো ব্যাগ গুছিয়ে বাবার বাসা। এজন্যই শশুড় বাড়ি অনেক দূরে হতে হয়, বৌ যাতে কথায় কথায় বাপের বাড়ির ভয় দেখাতে না পারে। অন্যদিকে তাকিয়ে বললোঃ
.
–আমি গেলাম।
.
-আমাকে গিয়ে নিয়ে আসতে হবে নাকি নিজেই চলে আসবা। আমার কাছে কিন্তু রিক্সা ভাড়ার টাকা নেই। আনতে যেতে পারবোনা।
.
–তোমাকে আনতেও যেতে হবেনা আমিও আর আসবোনা। মুহিকে নিয়ে গেলাম।
.
-ভালো কথা, কিন্তু এ ঘরে তোমার জিনিসপত্র যা আছে সেগুলো কি আমাকে দিয়ে গেলে?
.
–আমার ভাই এসে নিয়ে যাবে।
.
-প্লিজ তোমার ভাইকে পাঠাইয়োনা, সালা মটুর চুরির স্বভাব আছে দেখা গেলো তোমার জিনিস রেখে আমার জিনিস নিয়ে পালিয়েছে।
.
রাত্রি কিছু বললোনা, রাগে কটমট করতে করতে মুহির হাত থেকে টিভির রিমোটটা নিয়ে আমার দিকে ছুড়ে মারলো, ভাগ্য ভালো বৌয়ের হাতের নিশানা খুব একটা ভালো না।
বসে বসে কয়েকটা সিগারেট শেষ করলাম, খালা যখন শুনলেন রাত্রি বাবার বাসা চলে গেছে তখন রান্না করার ভয়ে নিজেও বাসা পালিয়েছে। যাওয়ার সময় দরজায় বাড়ি খেয়ে কপালে একটা আলু নিয়ে গেছে।
.
.
চেয়ারে বসে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙ্গলো একটা ডাক শুনে সালা সালা সালা।
চোখ খুলে দেখি জানালায় একটা পাখি বসে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে সালা সালা করে চিল্লাচ্ছে। মাঝে মাঝেই এই পাখি জানালায় এসে আমাকে গালি দিয়ে যায়। বুঝিনা হারামজাদার সাথে আমার কিসের শত্রুতা। এটাও বুঝিনা পাখিটাকে কোন হারামজাদা কথা বলতে শিখিয়েছে। দুনিয়ায় এতো ভালো সুন্দর শব্দ থাকতে কেন একটা গালি শেখালো।
.
সন্ধ্যা পর্যন্ত টিভি দেখলাম, রিমোট ভেঙ্গেছে বডির বাটন নষ্ট সুতরাং কেকা আপার বিশেষ প্রোগ্রাম নুডুলসের পুডিং বানানো দেখছি। রান্নার অনুষ্ঠান দেখার সময় পেটের মধ্যে ক্ষুদা তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলো কিন্তু পুডিং বানানো শেষে তা দেখে ক্ষুধা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। কেকা আপার পুডিং দেখতে ছোট বাচ্চাদের পায়খানার মতো লাগছে।
.
মোবাইল ফোনটা হাতে নিলাম, ভাবছি রাত্রির রাগ কমেছে কি না। রাগ না কমলে যদি কল দেই তার মানে রাগ বাড়িয়ে দেয়া। তার কোন মানে হয়না, বরং মামা শশুড়কে কল দেই শুনছি তিনি বোনের বাড়িতে বেশ কিছুদিন যাবদ আছেন। ততোক্ষনে রাত্রির রাগ কমুক, রাগ কমলে নিজেই কল দিবে। মামা শশুড় কল রিসিভ করে বারবরের মতো করে বললেনঃ
.
–হ্যালো কে বলছেন?
.
-আপনার নাতনির আব্বু বলছি।
.
কোন একটা কারনে এই ব্যক্তি আমাকে খুব একটা পছন্দ করেন না।
.
–বলো কি বলবে?
.
-মামা আপনার না ডায়বেটিস, আপনার হিসু করার সময় হয়ে গেছে যান হিসু করে এসে তারপর খবরের কাগজ পড়ুন। নাহলে বলা যায়না খবরের কাগজে কোন বড় নিউজ পড়ে কাপড় নষ্ট হতে পারে।
.
–ইউ রাস্কেল, ইতর, আকাইম্মা, পল্টি মুরগীর পাছা…………
.
ফোনটা রেখে দিলাম। খুব ক্ষুধা পেয়েছে পকেট খালি। রাত্রি আলমিরাতে টাকা লুকিয়ে রাখে, দেখি যদি কয়টা টাকা পাই। নাহ্ অনেক খুঁজেও ১টা টাকা পেলাম না। কিন্তু আমার বিক্রি হওয়া বইয়ের পরো দশটা কপিই পেলাম। আশ্চর্যের বিষয় সব বইয়ের উপরে নীল কালিতে লিখা প্রিয় বই।
.
কোন কাজ কর্ম নেই, কি করা যায়। অনেক ভেবে চিন্তে কেকা আপার নুডুলসের পুডিং বানানোর চেষ্টা করলাম। তিন ঘন্টা এবং পাঁচবারের প্রচেষ্টার পরে হাগুর মতো দেখতে কিছু একটা বানিয়েছি। কিন্তু ঠিক কি বানিয়েছি নিজেও বলতে পারিনা। অনেক সাহস করে এক চামচ মুখে দিলাম। সত্যি জিনিসটা খেতে খারাপ না।
.
কলিং বেল অনেকক্ষন ধরে বাঁজছে, রাত্রি আসবে জানতাম কিন্তু রাতেই ফিরে আসবে সেটা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এই মুহুর্তে দরজা খোলা সম্ভব না। আমি কমোডে বসে আছি। পুডিং খাওয়ার পর থেকে পেটের মধ্যে গুড়গুড় করছে। অনেকক্ষন পরে দরজা খুললাম, রাত্রি যে আবারো রাগতে শুরু করেছে তা তার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে। এই মেয়ে খুব দ্রুত রেগে যেতে পারি। অলিম্পিকে দ্রুত রাগার প্রতিযোগিতা হলে নিশ্চই সে গোল্ড জিততে পারতো।
রাত্রি রাগলে কিন্তু খুব মিষ্টি দেখা যায়। ফর্সা গালগুলো, কান দুটো, এমনকি নাকটাও লাল হতে শুরু করে। ঠোঁট কাঁপতে থাকে। কিন্তু বেশি রাগলে সমস্যা। মার্বেল সাইজের চোখগুলো দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তেই থাকে। চোখে এতো পানি আসে কিভাবে কে জানে।
.
–দরজা খুলতে এতোক্ষন লাগে?
.
-সরি।
.
–সারাদিন কিছু খেয়েছো?
.
-কেকা আপার পুডিং।
.
–মানে?
.
-না কিছুনা।
.
–আমি বাসা থেকে রান্না করে এনেছি, গরম করে খেয়ে নাও। ধরো মুহিকে কোলে নাও, রিক্সায় ঘুমিয়ে পড়েছে। কোলে নিয়ে থাকতে থাকতে হাত ব্যাথা হয়ে গেছে।
.
মুহিকে কোলে নিতেই সে চোখ খুলে বললোঃ
–আব্বু জানো নতুন নানাভাই না তোমাকে ছাগল বলেছে। তুমি কি ছাগল?
.
-না আম্মু ওসব পঁচা কথা বলতে হয়না।
.
–আমি জানি সেজন্য নতুন নানাভাই যখন তোমাকে ছাগল বলছে তখন আমি নানাভাইয়ের জামার ভেতরে বরফ ঢুকিয়ে দিছি।
.
-সাব্বাস আম্মু, এই না বাপকা বেটি।
.
রাত্রি চুপচাপ দাঁড়িয়ে মুহি আর আমার কথা শুনছিলো। তারপর বললোঃ
.
–তোমাদের কথা শেষ হলে যাও খাবারটা গরম করো আমি কাপড়টা পাল্টে আসি।
.
.
তিনজন খেতে বসেছি, রাত্রি আমার দিকে না তাকিয়েই বললোঃ
–তোমার বই বের করতে কতো টাকা লাগবে?
.
-টাকা লাগবেনা।
.
–কেন?
.
-এমনি অযথা টাকা নষ্ট।
.
–সেটা বললে তো হবেনা। এটার জন্য তুমি সংসারে রামায়ণ শুরু করেছো এখন বলছো বই বের করবেনা। মগের মুল্লুক পেয়েছো? যা বলবে তাই হবে। আমার কাছে কিছু টাকা আছে, যদি আরো লাগে ব্যবস্থা হবে।
.
-টাকা কোথায় পেলে?
.
–মায়ের কাছে আমার দুটো চুড়ি রেখেছিলাম।
.
-বিক্রি করেছো কেন?
.
–বিক্রি কি সাধে করেছি। সামনের বছর দুটার পরিবর্তে চারটা নতুন ডিজাইনের বানিয়ে দিবা।
.
-কিন্তু…
.
–কিন্তু কি?
.
-পান্ডুলিপি তো পুড়িয়ে ফেলেছি।
.
–ভালো করেছো আবার নতুন করে লিখবা।
.
.
রাত তিনটা আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে রাত্রির দিকে তাকিয়ে আছি। সে ঘুমাচ্ছে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুকে চিনচিনে ব্যাথা হয়। কি নিষ্পাপ সেই মুখখানি। কিছুক্ষন পরে কাগজগুলো হাতে নিলাম, এতোক্ষন কি লিখেছি পড়ে দেখার জন্য কিন্তু আশ্চর্য সবগুলো পৃষ্ঠা জুড়ে শুধু রাত্রির নাম লিখা।

 

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here