অদেখা অনির্বাণ
বনশ্রী বড়ুয়া
মায়ের শরীরটা যাচ্ছেতাই
রাতে ঘুমাতে পারেন না,
সম্ভবত মৃত্যুভয় পেয়ে বসছে
রক্তে সুগার বেড়েছে,
প্রেশারটা উঠানামায়, তার উপর হাঁপানি, খুব জ্বালায় ভোর রাতের দিকে,
রোজ রোজ আরো কতশত ব্যামোরা এসে মায়ের সঙ্গে ভাব করে যায়।
মাকে কখনো বয়সের ভারে নুয়ে থাকতে দেখি নি,
শুনেছি যৌবনে বড্ড তেজস্বিনী ছিলেন মা,
বাবাকে বলতে শুনেছি, ভীষন ভাল ছবি আঁকতেন মা,
অবশ্য আমিও মায়ের আঁকা ক’টা ছবি দেখেছিলাম
সব হাবিজাবি মানুষের মুখ।
মন খারাপ হলেই মা নাকি মানুষের মুখ আঁকতেন,
মায়ের আবৃতির স্বর দারুন,
এত কারুকাজ যেন মোক্ষম শিল্পীর স্বর, মুগ্ধ হয়ে শুনতাম, সেও কতকাল আগে,
ইদানিং কবিতায় তার মন থাকে না,
কথা বলেন না,
এক গভীর দূরত্বে নিজেকে বেঁধে রেখেছেন।
আমাদের মায়ের এক ব্যক্তিগত জীবন আছে,
সেখানে প্রবেশের অধিকার কারো নেই, মাঝেমাঝে একা একা কথা বলেন,
হাসেন আবার হু হু করে কাঁদেন,
বাবা শুধু বলতেন, এ সময় মায়ের কাছে যেও না,
মাকে কাঁদতে দাও, বাবাও তখন খুব দূরে সরে যেতেন, খুব দূরে
আমি বুঝি না, মায়ের ব্যক্তিগত জীবনে বাবার প্রবেশাধিকার কেন নেই?
নানুর কাছে শুনেছি, বাবা মার নাকি ভালবাসার বিয়ে।
আচ্ছা ভালবাসলে বুঝি দূরে থাকতে হয়?
কি জানি!
অনেক সন্ধ্যে চলে যায়, ঘরে ফিরে যায় সূর্য,
মা’র সাথে কথা হয় না আমাদের,
সেদিন মা ডাকলেন, হাতে একটা নীল খাম
গন্তব্য ২৮৭ নম্বর চন্দনপুরা রোড
খামের উপর লেখা “অনির্বাণ”
কে এই অনির্বাণ?
কি লেখা আছে চিঠিতে ?
মায়ের অসুস্থতার কথা?
হাঁপানি, ব্লাড পেশার নাকি মেরুদন্ডের ব্যথার কথা?
নাকি মায়ের বাক্সবন্দী নূপুর জোড়ার কথা, যা মা আমাদের কখনোই ছুঁয়ে দেখতে দেন নি।
মায়ের নীল শাড়ির জমিনে একটা মানুষের ছবি এঁকেছিল মা,
আঁকা ছবিটা কার আমরা জানি না,
আচ্ছা এটা কি অনির্বাণের ছবি?
মাকে দেখতাম ভাদ্রমাস আসলেই শাড়িটা রোদে শুকাতেন,
সবার অগোচরে বার বার ছুঁয়ে দেখতেন?
শাড়িটা কি অনির্বাণ দিয়েছিল?
বাবা শুধু বলত, মাকে মা’র মতো থাকতে দাও।
একদিন লুকিয়ে দেখেছি, মা কাঁদছিলেন হাউমাউ করে, আর বাবা মাকে বুকে চেপে ধরে রেখেছেন
যেন বৃষ্টিভেজা একটা পাখি,
উষ্ণতায় মুখ লুকিয়ে আছে।
আমি জানি না কে এই অনির্বাণ?
অনির্বাণ কি মায়ের ফেলে আসা অতীত, যার সাথে মা রোজ কথা বলে, হাসে, কাঁদে?
আচ্ছা, মা কাঁদে কেন?
চারপাশটা কেমন গুমোট হয়ে আছে,
মেঘমালার আনাগোনা আকাশজুড়ে,
আমি রিক্সা, ট্রাম, বাস
অতঃপর খুঁজে খুঁঁজে ২৮৭ নম্বর চন্দনপুরা রোড
গাছগাছালিতে ভরা ভেতরটা
মনেহয় কতকাল কেউ আসেনি এপাশটায়
একজন বুড়োমতন লোক, দেখেই বুঝা যায় দাঁড়োয়ান।
অনির্বাণ কে? প্রশ্ন করতেই অবাক হয়ে আমাকে দেখলেন?
চুপচাপ হেঁটে গেলেন, একটা শিউলিগাছের তলায়।
এসে থামলেন, চার দেয়ালে ঘেরা একটা কবরের কাছে।
সেখানটায় বড় বড় অক্ষরে লেখা—–
‘ আমাদের দেখা হবে’
“অনির্বাণ”
কেন জানি আমার খুব কান্না পাচ্ছে, মায়ের মুখটা চোখে ভাসছে,
আমার মা ছোট্ট শিশুর মতো
হাউমাউ করে কাঁদছে বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে।



